লন্ডন— এক সময়কার প্রবল আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং পরবর্তীতে আল-জাজিরার সেই বহুল আলোচিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন’ প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান উৎস জুলকারনাইন সায়ের এখন এক গভীর রাজনৈতিক ও পেশাদার সংকটের মুখোমুখি। যে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির তাকে এতদিন ‘বিপ্লবী সাংবাদিক’ হিসেবে মাথায় তুলে রেখেছিল, তারাই এখন তার তথ্যের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এই ত্রিমুখী চাপে পড়ে সায়ের তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের বিবর্তন নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন।
সায়েরের অতীত বিশ্লেষণে দেখা যায়, একদা তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনীতির প্রতি প্রবল অনুগত ছিলেন। তবে রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনে তিনি সেই বলয় থেকে বিচ্যুত হন এবং তৎকালীন সেনাপ্রধানের দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করে সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হন। সেই সময়েই জামায়াত ও শিবির তাকে তাদের অলিখিত মুখপত্র হিসেবে গ্রহণ করে এবং তার প্রতিটি প্রতিবেদনকে ‘আকাশবাণী’র মতো ধ্রুব সত্য বলে প্রচার করতে থাকে।
সম্প্রতি জামায়াত প্রার্থীর সাথে সামরিক পুলিশের বিবাদ এবং বিমানবন্দরে নগদ অর্থসহ জামায়াত নেতার আটকের খবর প্রকাশের পর এই সুসম্পর্কে ফাটল ধরেছে। বিষয়টি নিয়ে ‘নীল দর্পণ’-এর পক্ষ থেকে সায়েরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত হতাশাজনক এবং দার্শনিক কণ্ঠে তার ‘আদর্শিক নিঃসঙ্গতা’র কথা তুলে ধরেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সায়েরের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র তার বয়ান উদ্ধৃত করে বলেন, “সায়ের সাহেব অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে জানিয়েছেন যে, তার সাথে যা হচ্ছে তা এক অদ্ভুত পরিহাস। তিনি বলেছেন, ‘আগে আমি যখন আওয়ামী লীগের দুর্নীতির কথা বলতাম না, তখন তারা আমাকে আপন ভাবত। কিন্তু যখনই আমি সত্য বলতে শুরু করলাম, আওয়ামী লীগ আমাকে ছেড়ে দিল। এরপর জামায়াত ও শিবির আমাকে তাদের ত্রাতা মনে করে কোলে তুলে নিল। আমি যখন অন্যের বিরুদ্ধে বলতাম, তখন আমি ছিলাম মহামানব। কিন্তু এখন যখন তাদের নিজেদের গুমর ফাঁস করছি, তখন তারাই আমাকে অবিশ্বাস করছে।’”
সায়েরের মতে, এই পুরো বিষয়টি একটি সর্পিল রেখার মতো। যখন তিনি জামায়াতের প্রতিপক্ষের তথ্য দিতেন, তখন তার তথ্যের উৎস নিয়ে শিবির কোনো প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু সেনাচৌকিতে জামায়াত প্রার্থীর আচরণের বডিক্যাম ভিডিও প্রকাশিত হতেই তাকে ‘সরকারের দালাল’ বা ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। সায়ের আক্ষেপ করে বলেন, “আসলে কেউ আমাকে ছাড়েনি, আমি কেবল তাদের সুবিধাবাদী সত্যের মাপকাঠিতে আটকে গিয়েছিলাম। যখনই আমি নিরপেক্ষ হতে চাইলাম, তখনই আমি অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম।”
এদিকে জামায়াতের নায়েবে শায়খ প্রফেসর এই আক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, সাংবাদিকতার মানদণ্ড হলো সেটিই যা দলের ভাবমূর্তিকে সমুন্নত রাখে। তিনি বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তিকে সমর্থন করি না, আমরা কেবল সেই সংবাদকে সমর্থন করি যা আমাদের পক্ষে যায়। সায়ের সাহেব সম্ভবত এই গাণিতিক সত্যটি বুঝতে ভুল করেছিলেন।”
বর্তমানে সায়ের এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে আওয়ামী মুসলিম লীগ তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ মনে করে এবং জামায়াতের নায়েবে শায়খ ও ছাত্রশিবির তাকে ‘অনির্ভরযোগ্য’ তকমা দিয়েছে। এই ‘আদর্শিক যাযাবর’ দশা থেকে সায়েরের উত্তরণ ঘটবে নাকি তিনি পুনরায় কোনো নতুন রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হবেন, তা এখন টক অব দ্য টাউন।
