ঢাকা — দেশের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে জামায়াত-শিবিরের অভাবনীয় পরাজয় এবং রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনের পর জনমনে এক নতুন বাকস্বাধীনতার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম যখন ‘ডাকসু কণ্ঠস্বর’, ‘বাঁশেরকেল্লা’ ও ‘বঙ্গইনসাইডার্স’-এর মতো ডজনখানেক ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং ও মানহানির অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করেছিলেন, সেই সময়কার ‘মব’ বা নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখন সাধারণ নাগরিকরা উচ্চকণ্ঠ হতে শুরু করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর একজন বুদ্ধিজীবী এই প্রতিবেদককে জানান, “সাদিক কায়েম যখন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও ডিএমপি কমিশনারের সাথে বৈঠক করে এই মামলাটি করেছিলেন, তখন দেশজুড়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ‘মব’ বা স্বঘোষিত অনলাইন বিচারব্যবস্থার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। সেই সময় আমরা আমাদের বাকস্বাধীনতাটি অত্যন্ত সযত্নে আলমারিতে তুলে রেখেছিলাম। এখন নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের পর আমরা বুঝতে পারছি যে, সেই মামলা এবং তৎকালীন আইনি কঠোরতা আসলে আমাদের কণ্ঠরোধ করার একটি গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা মাত্র ছিল। এখন পরিবেশ নিরাপদ, তাই আমরা আমাদের সেই হারানো সাহস ফিরে পেয়েছি।”
তৎকালীন সময়ে সাদিক কায়েমের দায়ের করা সেই মামলা প্রসঙ্গে জামায়াতের নায়েবে শায়খ প্রফেসর অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, “আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আমরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এবং ‘মব’ ও মামলার সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে যে ডিজিটাল শুদ্ধাচার ও ভীতি তৈরি করেছিলাম, তা মাত্র একটি নির্বাচনের ফলাফলে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আমাদের সাইবার সৈনিকদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত সেই ফলাফল—যেখানে কেউ আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেত না—তা আজ মানুষের মুখে মুখে উপহাসে পরিণত হয়েছে।”
এদিকে, ছাত্র শিবিরের একজন কেন্দ্রীয় নেতা তথ্য গোপন রাখার শর্তে বলেন, “আমরা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে নৈতিক শাসন ও ডিজিটাল নীরবতার দেওয়াল তুলেছিলাম, তা এখন ভাঙতে শুরু করেছে। আমাদের ভাইয়েরা যে ‘বাঁশেরকেল্লা’ বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডিজিটাল সতর্কতা ও নজরদারি বজায় রেখেছিলেন, তা এখন সাধারণ মানুষের সমালোচনার মুখে পড়ছে। আমাদের এই সুশৃঙ্খল অর্জিত ফলাফল এভাবে বিফলে যেতে দেখে আমরা রাজনৈতিকভাবে ব্যথিত।”
আওয়ামী মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, “আমরা জানতাম যে ‘মব’ বা সাইবার মামলা দিয়ে বেশিদিন ক্ষমতা বা আদর্শ টিকিয়ে রাখা যায় না। এখন যারা কথা বলছেন, তারা আসলে আমাদের সময়ের মতোই বাকস্বাধীনতা ভোগ করছেন—অর্থাৎ যখন কারো পতন ঘটে, তখনই কেবল সত্য বলা যায়। এটিই আমাদের দেশের প্রকৃত ও ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য।”
অন্যদিকে, বিএনপির আমির-এর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, “সাদিক কায়েমের সেই মামলা ছিল একটি বিশেষ সময়ের দাবি, যেখানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশীর্বাদ ছিল। এখন সময় পাল্টেছে। জনগণ এখন সেই মামলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলছে কারণ তারা জানে এখন আর সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ভয় নেই। এই সুবিধাবাদী বাকস্বাধীনতাকে আমরা স্বাগত জানাই।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাদিক কায়েমের সেই মামলা এবং পরবর্তী ‘মব’ ভীতি মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক টুল ছিল। নির্বাচনের ফলাফল সেই ভীতির চাদর সরিয়ে দিয়েছে, যার ফলে দীর্ঘদিন যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং জনসমক্ষে মৌন ছিলেন, তারা এখন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জামায়াত-শিবির ও তৎকালীন পরিস্থিতির সমালোচনা করছেন। একে ‘নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় কণ্ঠস্বর পুনরুদ্ধার’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
