ঢাকা — সারাদেশে হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ড এবং ফুটপাতে আধিপত্য বিস্তার ও দখলদারিত্বের অভিযোগ যখন তুঙ্গে, তখন জনসাধারণের মনোযোগ ডাইভার্ট করতে এক অভিনব ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধে’ অবতীর্ণ হয়েছে বিএনপি। দলটির উচ্চপর্যায় থেকে এখন চাঁদাবাজি বা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চেয়ে ‘ইনকিলাব’ শব্দের ব্যবহার এবং ভাষাগত শুদ্ধতা রক্ষা করাকেই জাতীয় অস্তিত্বের প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ফ্রন্টলাইন থেকে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বা ‘ইনকিলাব মঞ্চ’—এগুলোর সঙ্গে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা বলেন, “জনগণ যাতে আমাদের নেতাকর্মীদের ছোটখাটো ‘উপার্জন’ বা দখল নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে, সেজন্য আমরা একটি বৃহত্তর আদর্শিক শত্রু খাড়া করেছি। ইনকিলাব শব্দটি পাকিস্তান আমলের প্রেতাত্মা। আমরা এখন মানুষের পকেট নয়, বরং তাদের জবান থেকে বিজাতীয় শব্দ উচ্ছেদে বেশি মনোযোগী।”
মন্ত্রী টুকু অত্যন্ত গুরুগম্ভীর কণ্ঠে দাবি করেন, তিনি মাথা থেকে পা পর্যন্ত একজন জাতীয়তাবাদী এবং জীবন দেওয়ার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে ‘ইনকিলাব’ প্রীতির কারণে তার ভেতরে ‘রক্তক্ষরণ’ হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইনকিলাব বিরোধী অবস্থান নিলে তাকে ‘ভারতের দালাল’ বলা হতে পারে, তবুও তিনি সত্য প্রকাশে পিছপা হবেন না। যদিও তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল বামপন্থি ও নকশাল আন্দোলনের হাত ধরে, যেখানে ‘ইনকিলাব’ শব্দটি ছিল প্রধান চালিকাশক্তি, তবুও বর্তমান বাস্তবতায় তিনি এই অতীতকে স্রেফ একটি ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছেন।
এদিকে বিএনপির এই সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আওয়ামী মুসলিম লীগ। দলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, “সাংস্কৃতিক যুদ্ধ এবং ইতিহাস বিকৃতি আমাদের দীর্ঘদিনের নিজস্ব কপিরাইট। বিএনপি এখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছেড়ে আমাদের ব্যবসায়িক মডেলে ঢুকে পড়ছে। তারা চাঁদাবাজি আড়াল করতে যে দেশপ্রেমের কার্ড খেলছে, তা মূলত আমাদেরই পুরনো কৌশলের সস্তা অনুকরণ।”
অন্যদিকে, জামায়াতের নায়েবে শায়খ প্রফেসর এই বিতর্কে এক ভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। তিনি বলেন, “ইনকিলাব একটি পবিত্র বিপ্লবী চেতনা। বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্য বা দখলের চেয়ে ইনকিলাব রক্ষা করা বেশি জরুরি। আমরা চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্ব নিয়ে খুব একটা বিচলিত নই, কারণ এগুলো পার্থিব ও অস্থায়ী। কিন্তু ইনকিলাব শব্দটি হাতছাড়া হওয়া মানে পরলৌকিক ক্ষতি। প্রয়োজনে আমরা চাঁদাবাজি সহ্য করব, কিন্তু ইনকিলাবের অবমাননা নয়।”
